October 07, 2014

মহাভারতের রাজনীতির দুইটি ধারা

কুরু বংশের ১০০ সন্তান, পিতামহ ভীষ্ম, গুরু দ্রোনা, অভিমানী ও অবহেলিত দাম্ভিক কর্ণ, লোভী অশ্বর্থমা এই নিয়ে কুরুকুল যতটুকু শক্তিশালী ছিলো তাঁর থেকে কোন অংশে শক্তির বিচারে কম ছিলেন না পঞ্চ পান্ডব। দেবতাদের থেকে প্রান্ত কুন্তি মাতার ৫ সন্তান ছিলেন জন্মগত ভাবেই গুণী। কিন্তু বরাবরই পঞ্চ পান্ডবদের কুরু কূটনৈতিক চালে পরাজিত হতে হয়েছিলো। মামা কুচক্রী শকুনি, দুর্যোধন ও ধীতরাষ্ট্রের চক্রান্তে বার বার পরাস্ত হতে হয়েছিলো পাণ্ডবদের। মুলত ব্যবধান রচনা করে দিয়েছিলো কুচক্রী শকুনি। পাণ্ডবরা ধার্মিক ছিলেন বলে তাঁরা অন্যের দুর্বলতাকে বিবেচনা করে আঘাত করতেন না কিন্তু শকুনি, দুর্যোধন,অশ্বর্থমা এরা সব সময় ধর্মীয় অনুশাসনে থাকা পাণ্ডবদের পরাস্ত ও আঘাত করতো তাঁদের ধর্মীয় ভাবের বলয়কে পুঁজি করে।

ধার্মিক হয়ে ও পিতামহ ভীষ্ম ও মহামন্ত্রি বিদুর কুরুদের ঐ কুচক্রী রাজনীতিকে ভেদ করে ধার্মিক পাণ্ডবদেরকে হস্তিনাপুড়ে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেননি বরং তাঁরা শকুনির কুচক্রের কাছে অসহায় হয়েই ছিলেন।
 
মহাভারতের রাজনীতির দুইটি ধারা। একটা ধারায় ভালো অন্য ধারায় মন্দ। পরাক্রমের দিক থেকে শক্তিশালী হয়ে ও পাণ্ডবরা বার বার পরাস্থ হয়েছিলো কিন্তু যখন থেকে ভগবান শ্রী কৃষ্ণ পাণ্ডবদের সাথে যুক্ত হয়েছিলেন তখন থেকে কুচক্রী শকুনির এক একটি চাল ব্যর্থ হতে থাকে। ভগবান শ্রী কৃষ্ণ নিজে অস্ত্র ধারণ না করে শুধু মাত্র রাজনৈতিক পরামর্শ দিয়ে পাণ্ডবদের প্ররাক্রমকে ব্যবহার করে কুরু বংশ তথা অন্যায়কে ধংস করে ন্যায় তথা পাণ্ডবদের হস্তিনাপুরে প্রতিষ্ঠিত করেন। এই বৃহৎ অর্জনে পঞ্চপান্ডবরা অক্ষত ছিলেন, কাউকে প্রাণ দিতে হয়নি।

পিতামহ ভীষ্ম নিজে ছিলেন ধার্মিক। তিনি নিজের চিন্তা কখনো করেননি। তিনি সব সময় হস্তিনাপুরের কথাই চিন্তা করেছিলেন। এই চিন্তায় তিনি ব্যক্তিগত সুখ সাচ্ছন্দকে ত্যাগ করেছিলেন। ধর্মের হাতে তিনি আবদ্ধ ছিলেন এবং রাজ মাতা সত্যবতী ও ধীতরাষ্ট্র ভীষ্মকে তাঁদের প্রয়োজনে অনেক বার অন্যায় ভাবে ব্যবহার করেছিলেন। অন্ধ বলে ধীতরাষ্ট্র অনেক অনেক অন্যায় সুবিধা নিয়েছিলেন পিতামহের ও রাজমাতার স্নেহের অন্যায় সুযোগকে পুঁজি করে। এখানে ও ধিতরাষ্ট্র রাজনৈতিক ভাবে সফল এবং পিতামহ ও রাজমাতা সত্যাবতী রাজনৈতিক দিক থেকে ব্যর্থ হয়েছিলেন।
 
হস্থিনাপুরের রাজা শান্তনু ও গঙ্গা পুত্র ছিলেন পিতামহ ভীষ্ম। ভগবান পরশুরামের শিষ্য ছিলেন তিনি। পিতার যোগ্য উত্তরাধিকারী হবেন বলে মাতা গঙ্গা তাঁকে ভগবান পরশুরামের শিক্ষায় পরাক্রমশালী করে গড়ে তুলেন। জন্মগত ও গুরুর বিদ্যা অর্জন করে তিনি এতো বেশি পরাক্রমশালী ও ধার্মিক ছিলেন যে, অনেক বিষয়ে তিনি দেবতাদের সমমানের শক্তি ধারণ করতেন। তিনি একজন শ্রেষ্ঠ বীর ও ধার্মিক কিন্তু মহাভারত বা হস্তিনাপুরের রাজনীতিতে তিনি রাজনৈতিক ভাবে চরম ব্যর্থ ছিলেন। রাজ্য নীতি থেকে তিনি মানবীয় আবেগকেই বেশি প্রাধান্য দিয়েছিলেন।

রাজা শান্তনু ও মাতা গঙ্গার সন্তান ভীষ্ম মহা পরাক্রমশালী হয়ে যুবরাজ পদের জন্য তৈরি হয়েছিলেন। রাজা শান্তনুর ২য় স্ত্রী মৎস্য কন্যা সত্যাবতি শর্ত প্রদান করেন যে, রাজা শান্তনুকে হয় রাজ্য ছাড়তে হবে বা সত্যাবতির ছেলেকে যুবরাজ পদে অভিষিক্ত করতে হবে যদি তাঁর সাথে সংসার করতে চান তবে!! কিন্তু ন্যায় পরায়ণ রাজা শান্তনু কোন ভাবেই মেনে নিতে পারেননি এই অন্যায় দাবী। এখানে উল্লেখ করতে হচ্ছে যে সত্যবতীর ছেলে বিচিত্রবীর্য যুবরাজ পদের জন্য অযোগ্য ছিলেন। রাজা শান্তনু ভিস্মকেই যুবরাজ পদে অধিষ্ঠিত করার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছিলেন। পুত্র ভীষ্ম পিতার দুঃখ বুঝতে পেরে পিতার সুখ ফিরিয়ে আনতে মৎস্য কণ্যার কাছে গিয়ে প্রতিজ্ঞা করেন তিনি বিয়ে করবেন না, কোনদিন রাজা হবেন না এবং আমৃত্যু হস্তিনাপুরের সিংহাসনকে সুরক্ষিত রাখবেন। বিনিময়ে পিতা তাঁকে ইচ্ছা মৃত্যুর বড় দান করেন।

“ভীষ্মের এই প্রতিজ্ঞা মহাভারতের রাজনৈতিক বিশ্লেষণে সব থেকে বড় ভুল ছিলো”

পিতামহ ভীষ্ম রাজণৈতিক ভাবে সফল হলে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে করতে হতো না এবং এতো এতো প্রাণ অকালে ঝরে পড়তোনা। মানুষ লোভে ভুল করে বা মানুষ স্বার্থপর হয়ে ভুল করে কিন্তু পিতামহ এক অনন্য দৃষ্টান্ত। নিজের স্বার্থে বা নিজের জীবনের কথা তিনি কখনো ভাবেননি, সমস্ত সুখ সাচ্ছন্দ তিনি ত্যাগ করেছিলেন হস্তিনাপুরের জন্য। ধর্ম ও হস্তিনাপুরের মঙ্গল এই চিন্তাই তিনি নিমগ্ন ছিলেন।

এক জন রাজা বা যুবরাজের ব্যক্তি সত্ত্বা থেকেও রাজ্যের প্রজাদের মঙ্গলের জন্য ভুমিকাই বড়। ভগবান রাম স্ত্রী না প্রজা এই দৈত অবস্থানে নিজের ব্যক্তি সার্থকে ত্যাগ করেছিলেন নির্দয় ভাবে। প্রাণের থেকে প্রিয় স্ত্রীকে অগ্নি পরীক্ষায় দিয়েছিলেন প্রজা প্রতিপালনের স্বার্থে। প্রকৃত পক্ষে রাজার ব্যক্তি স্বার্থ থেকে প্রজা ও রাজ্যের স্বার্থই বড়।
এই ধারাবাহিক পোষ্ট এর মুল বিষয় মহাভারতের রাজনীতি। এই রাজনীতিতে তিন জনের তিন ধরনের ভুমিকা ছিলো। এই তিন জন হলেন পিতামহ ভীষ্ম, কুচক্রী শকুনি ও ভগবান শ্রী কৃষ্ণ। শুধু মাত্র রাজনৈতিক বিবেচনায় কুচক্রী শকুনি শ্রেষ্ঠ ছিলেন ভগবান শ্রী কৃষ্ণের হস্তক্ষেপের পূর্ব পর্যন্ত। পিতামহ ভীষ্ম বার বার রাজনৈতিক ভাবে পরাস্ত হয়েছিলেন কুচক্রী শকুনির কাছে এর কারণ হলো পিতামহ সব পরিস্থিতিকে শুধু মাত্র ধর্ম ও পূর্বে ধর্মে উল্লেখিত নীতি দিয়েই বিচার করতেন। পিতামহ নিজের প্রতিজ্ঞার কারণে রাজনৈতিক ভাবে দুর্বল অবস্থানে ছিলেন। কুচক্রী শকুনি সব সময় প্রতিপক্ষের শক্তিকে পাশ কাটিয়ে দুর্বলতাকে খুঁজে বের করতো এবং নিজের পরিকল্পনা গুলিকে সফল ভাবে নিজের অনুকুলে নিয়ে আস্তো। প্রয়োজনে অসম্ভব অমায়িক ব্যবহার করে পরিস্থিতিকে নিজের অনুকুলে নিতে শকুনিকে কখনো বেগ পেতে হয়নি। যেখানে রেগে যাওয়ার কথা সেখানে ও তিনি অমায়িক ও ধিরস্থির।

অযোগ্য, বেভিচারী, অহংকারী দুর্যোধনকে যুবরাজ পদে অভিষিক্ত করতে শকুনি বুদ্ধিমতী রাজমাতা সত্যবতী, পিতামহ ভীষ্ম, বিচক্ষণ মহামন্ত্রি বিদুরকে অকার্যকর করতে খুব বেশি বেগ পেতে হয়নি। শুধু মাত্র কুরু ও পাণ্ডব যুবরাজদের গুরু গৃহে পাঠানোর পূর্বে পিতামহ ভীষ্ম শকুনিকে গান্ধারের রাজা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে হস্তিনাপুর হতে বিতাড়িত করেছিলেন। এখানেই শকুনি রাজনৈতিক ভাবে ব্যর্থ হয়েছিলেন পিতামহের কাছে।

No comments:

Post a Comment